বার্তাকক্ষঃ
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে ‘ডিজাইন ও কনস্ট্রাকশন লাইসেন্স’ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)।
রোববার (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কমিশন চেয়ারম্যান মাহবুবুল হকের হাতে সনদটি তুলে দেন বায়েরার চেয়ারম্যান ড. নঈম চৌধুরী।
এখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের মূল কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নীতিমালা অনুযায়ী মূল নির্মাণ কাজ শুরু করার আগে এই সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এই অনুমতি প্রদানে আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (আইএইএ) সব নিরাপত্তা মানদণ্ড ও নীতিমালা, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা ‘যথাযথভাবে’ অনুসরণ করেছে।
লাইসেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আ ফ ম রুহুল হক, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ।
ইয়াফেস ওসমান বলেন, “বাংলাদেশ এখন পরমাণু যুগে প্রবেশ করেছে। ৩৩টি পরমাণু শক্তিধর দেশের কাতারে নাম লেখাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আজকে এই লাইসেন্স প্রদানের পর রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের মূল কাজ শুরু হবে।”
ফুকোশিমায় পরমাণু কেন্দ্রে বিস্ফোরণের পর রূপপুর প্রকল্প গ্রহণের আগে জাপান সফরে যাওয়ার কথা বলেন ইয়াফেস ওসমান।
“আমরা জাপানে গিয়ে জানলাম, এই বিস্ফোরণে জাপানের কোনো মানুষ মারা যায়নি, কারও ক্ষতি হয়নি। জাপান বলল, পরমাণু প্রকল্প থেকে তাদের সরিয়ে দিতে বহির্বিশ্ব নানা ষড়যন্ত্র করেছে। আমরা এসে বললাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে।”
ব্যবহৃত জ্বালানির ব্যবস্থাপনা কেমন হবে, তা জানতে ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন বিজ্ঞানমন্ত্রী। ৯০ শতাংশ খরচ বহন করতে হবে জেনে ফ্রান্স এই প্রকল্পে এগিয়ে না আসায় মূল প্রকল্পের সহায়তাকারী রাশিয়ার এগিয়ে আসার কথা বলেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, “পরমাণু প্রকল্পের ব্যাপারে আমরা এখনও ছাত্র। আমরা রুশ কোম্পানিগুলো থেকে এখনও শিখছি। আর এটা একটা বড় সুযোগ আমাদের জন্য, আমরা দেশটাকে অন্য একটা লেভেলে নিয়ে যেতে চাই। এ ধরনের প্রজেক্ট কনফিডেন্স বিল্ডিংয়েরও সুযোগ।”
অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, “পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। এখন আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হল, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের নিরাপত্তা ইস্যু। এটা নিয়ে অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট, রোস্টেকনজরের প্রকৌশলীদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।”
অনুষ্ঠানে বায়েরার চেয়ারম্যান নঈম চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন কমিশন চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক,রাশিয়ার রেগুলেটরি সংস্থা রোস্টেকনজরের ডেপুটি চেয়ারম্যান অ্যালেক্সি ফেরাপনতভ, বায়েরার পরিচালক ড. সত্যজিৎ ঘোষ, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর।
অ্যালেক্সি ফেরাপনতভ বলেন, “রূপপুর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যে শুধু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে, তা কিন্তু নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেকগুলো ক্ষেত্রও কিন্তু এতে লাভবান হবে।”
২০১৩ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরের সময় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারিগরি গবেষণার জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার একটি চুক্তি হয়। ওই বছরই অক্টোবরে রূপপুরে হয় ভিত্তিস্থাপন।
পরে রুশ সরকারের সহায়তায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ান ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর চুক্তি হয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের। অ্যাটমস্ট্রয় রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।
দুই ইউনিট মিলিয়ে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা)।
মূল পর্বের কাজ বাস্তবায়নে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে রাশিয়া ৪ শতাংশ হারে সুদে ৯১ হাজার ৪০ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে।
এ প্রকল্পটির ব্যয়ে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৫২৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, ভারতীয় ঋণ থেকে ৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ২৩৫ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।
সরকার আশা করছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে রূপপুরের ৫০ বছর আয়ুর ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ যোগ হবে জাতীয় গ্রিডে। পরের বছর চালু হবে সমান ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট।
