।। মোঃ সরোয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস ।।
গত শুক্রবারে (২২জুন) জাহিদ মারা গেল, দাফন হল।গতকাল সোমবার ধর্মীয় বিধান কিংবা সামাজিক প্রথা যাই বলেন তার জিয়ারত অনুষ্টান শেষ হল। দুপুরের খাওয়ার পর জাহিদের দলীয় নেতা কর্মী, শুভাকাংখী, সতীর্থরা ঘিরে ধরল, আপনি জাহিদ ভাইকে নিয়ে কিছু বলেন কিংবা প্রত্রিকাতে জাহিদ ভাইকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদীর রাজনীতির সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লেখেন। অবশ্য লেখার বিষয়টা নিয়ে আমি ইতিমধ্যে চিন্তা করেছি, তাই তাদের বললাম ঠিক আছে লিখব।তারা বেশ খুশী হল বলে মনে হল। আমিও বাসায় চলে আসলাম।
আজকের পরে হয়ত সবারই আবেগ কমতে থাকবে, সবাই যে যার কাজে লেগে যাবে। হয়ত জাহিদ পৃথীবি থেকে হারিয়ে যাবার ন্যায় ধীরে ধীরে মানুষের মন খেকেও হারিয়ে যাবে। কিন্তু আমি। আমার তো কোন কাজ নাই। আমার আবেগ, আমার অশান্তি, আমার মনোবেদনা কাটবে কিসে? বই পড়ে। না তা সম্ভব নয়। কারন বইয়ের সাদা পাতার কালো অক্ষর গুলি আমার চোখে ধরছে না, কিছুতেই মনের গভীরে ঢুকছে না। বরং অশান্তি আরও বাড়ছে।
হঠাৎ মনে পড়ল, কলকাতা কলেজ স্ট্রীটে বইয়ের বাজারে ঘুরতে ঘুরতে বেশ কয়েকটি পছন্দের বই কিনেছিলাম। ইতিমধ্যে সংগে থাকা আমার ছোট মেয়ে কোন একটা দোকান থেকে কিনে মলাট লাগানো অবস্থায় একটা বই দিয়ে বলল, আমার পক্ষ থেকে তোমাকে কলকাতার উপহার। তোমার যখন খুব মন খারাপ লাগবে তখন তুমি বইটা পড়বে। কারনটা অবশ্য জিজ্ঞাসা করি নাই। আমারও আর খেয়াল ছিল না। বইয়ের স্তুপে বইটা অবিকল পড়েছিল।
এই দু:সময়ে হঠাৎ খেয়াল হল।তাই বইটা খুজে বের করে কাগজের মলাট খুললাম। দেখলাম, বইটার নাম " সত্য দর্শন" এবং লেখক "মহাত্মা গান্ধী "। নাম দুইটাই ভাল লাগল। পড়তেও ইচ্ছা হল। পাতার পর পাতা পড়ছি আর যেন একের পর এক অনেক গভীরে ঢুকে যাচ্ছি। দুনিয়ার কোন দু:খ বেদনা কোনটাই যেন আর মনে নাই। অনেকের কাছে শুনেছি, মানুষ যখন মনের অশান্তি বা হাতাশায় নিমজ্জিত হয় তখন নাকি ধীরে ধীরে নেশার জগতে ঢুকে যায়। তাই বলছি মনের মত বই হলে অশান্ত মনকে শান্ত করতে মদ, গাজা, হিরোইন, চরোস, ইয়াবা বা তার চেয়ে কঠিন কোন মাদকের প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রয়োজন পড়বে ভাল বই পড়ার সদিচ্ছা সৃষ্টি করার।
হঠাৎ পড়ার ঘরে আমার এক বন্ধু ঢুকে আমার পড়ার মুডটা অফ করে দিল। সে অবশ্য এসেছিল, আমার মানসিক অবস্থা চিন্তা করে আমাকে কিছু সময় দেবার জন্য, গল্প করার জন্য, আড্ডা দেবার জন্য। যাই হউক পাশে বসেই বইটা আমার হাত থেকে নিয়ে বইটা দেখে বলল নিশ্চয়ই খুব ভাল বই।
এর পরেই আমার কাছে তার জিজ্ঞাসা তুমি কতজন গান্ধীকে জান। আমি বললাম, আমি তো শুধু মহাত্মা গান্ধীজিকেই জানি, যিনি নাকি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরাধা এবং ভারতীয় জাতীর পিতা। কেন আর কোন গান্ধীকে জান না। আমি বললাম না। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হল, বাবার মুখে আর এক গান্ধীর কথা শুনেছিলাম। তিনি নাকি পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। পাকিস্তান স্বাধীন হবার পরে তিনি আফগানিস্তান চলে গিয়েছিলেন। আমৃত্যু সেখানে থেকেই পাকিস্তানের সেবা করেছেন। তাকে নাকি বলা হত "সীমান্ত গান্ধী" আমার বন্ধু আর কোন গান্ধীকে জানি কিনা জিজ্ঞাসা করল।
আমি সরাসরি বললাম "না"। সে কিন্তু বলল, বিলেত গান্ধী বলে আর একজন গান্ধী আছে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম, এ ধরনের গান্ধীর কথাতো আমি শুনি নাই, কি নাম তার। সে বলল আমি নাম জানি না, তবে বিলত গান্ধী বলে কারও অস্তিত্ব আছে আমি এই টুকু শুনেছি। সে নাকি বিলেতে বসে বসে লেখালেখি করে, ওয়াজ নসিহত করে সীমান্ত গান্ধীর মত বাংলাদেশের সেবা করে চলেছে।
আমাকে বলল, তুমি একটু সন্ধান করে দেখ, খোজ পাওয়া যেতে পারে। এর পরে বন্ধু আমার, এ প্রসঙ্গে না থেকে অন্য প্রসঙ্গে কিছু কথা বলে, গল্প করে, সময় কাটিয়ে, এক কাপ চা খেয়ে সন্ধার আগেই চলে গেল। কিন্তু আমি তো সারা রাত ধরে চিন্তুা করে, কয়েকজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে কিছুতে হদিস করতে পারলাম না, আর পাব বলে আস্থাও রাখতে পারছি না। তাই বন্ধুরা ফেসবুকে লিখে আপনাদের শরনাপন্ন হলাম। কেউ জানলে বা হদিস পেলে দয়া করে জানাবেন।
লেখকঃ বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট।
