নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
চাঁদার টাকা না পেয়ে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে প্রকাশ্যে মারধর ও লাঞ্চিত করেছে উপজেলা ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ ও ক্যাডাররা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ জুন) বিকেলে ঈশ্বরদী সরকারী কলেজ ক্যাম্পাসের এই ঘটনায় আজ শুক্রবার সকালে ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের হয়েছে।
মামলায় উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি ও সাধারন সম্পাদক সুমন দাস এবং কলেজ শাখার সভাপতি খন্দকার আরমান ও সাধারন সম্পাদক সাব্বির হাসানসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় কলেজের সাধারণ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলা সূত্রে জানা যায়, কোন ধরনের অনুমোদন ছাড়াই ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রলীগ নেতারা কলেজের নামে প্রসপেক্টাস ও পাঠ্যসূচী প্রিন্ট করে নিয়ে এসে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীতে ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কলেজ কর্মচারীদের বিক্রি করতে বাধ্য করেন। বিক্রির সকল অর্থ তারা হিসেব নিকেষ না করেই নিয়ে যান। কলেজ অধ্যক্ষ বিষয়টি অবগত হলে এই অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে,রনি তার দলবল নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের কাছে প্রস্পেক্টাস ছাপার টাকা চাঁদা হিসেবে দিতে বলেন। তাতে সম্মত না হওয়ায় ভাংচুর ও অকথ্য গালিগালাজ করে শিক্ষকদের মারধর করেন তারা। এ সময় কলেজ অধ্যক্ষ ড.আব্দুস সবুর, উপাধ্যাক্ষ আব্দুল জলিল সহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক আহত হন।
ঈশ্বরদী সরকারী কলেজ শিক্ষক পরিষদের সাধারন সম্পাদক মুরালী মোহন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি মূলত ভর্তির দায়িত্বে থাকার কারনে মারপিটের সময় ছিলাম না, তবে পরে এসে দেখি স্যারের রুমে ভাংচুর হয়েছে। এ ঘটনায় স্যার বাদী হয়ে একটি মামলাও করেছেন।
এ বিষয়ে কলেজের উপাধাক্ষ্য আব্দুল জলিল বলেন, আমরা সকল অন্যায় কাজের বিরোধিতা করলেই আমাদের উপর নির্যাতন নেমে আসে। ৬ ঘন্টা মুঠোফোন ছিনিয়ে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন করেন তারা। আমি কেবল অধ্যক্ষ স্যার একজন প্রফেসর ও ডক্টরেট করা ব্যাক্তি উল্লেখ করে তার গায়ে হাত তুলতে নিষেধ করায় আমার গলা ধরে নিঃশাস বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয় বলেই থেমে যান।
তিনি আরো বলেন, আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় মানসিক যন্ত্রনা নিয়ে এখানে আছি। আমরা কারো কিছু বলতেও পারছি না সহ্যও করতে পারছি না।
কয়েকজন শিক্ষক কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, ছাত্রলীগ নেতাদের কথা মতো কাজ না করার জন্যে আমাদের উপর এই হামলা করেন তারা। তাদের অন্যায় দাবী মেনে না নেওয়ার ফলে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি, সাধারন সম্পাদক সুমন কলেজ শাখার সভাপতি সাধারন সম্পাদকসহ তাদের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে অধ্যক্ষের রুমে গিয়ে এই হামলা চালায়। এ সময় সিসি টিভি, অফিস টেবিলের কাচসহ অন্যান্য আসবাবপত্র ভাংচুর করেন। অধ্যক্ষসহ উপস্থিত শিক্ষকদের মারপিট এবং অধ্যক্ষকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঈশ্বরদীতে ভূমিমন্ত্রী পুত্র তমাল বাহিনীর শীর্ষ ক্যাডার ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিব, সুমন, আরমান, সাব্বিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ পুরো ঈশ্বরদীবাসী। তারই ধারাবহিকতায় তারা কলেজেও ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে । ঘটনার দিনে তাদের দাবীকৃত চাঁদা না পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে কলেজ অধ্যক্ষ্যকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ব্যাপক মারপিট করে।
এছাড়া মাঝে মাঝেই তারা কলেজের গাছ কর্তন, শিক্ষার্থীদের সাথে খারাপ আচরণ, কোন ছাত্রীকে পছন্দ হলে জোর করে অনৈতিক কর্মকান্ড করার চেষ্টাসহ নানা ধরনের অপকর্ম করেন। কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস নেই, কেননা তারা ভূমিমন্ত্রী পুত্র তমালের লোক। তাদের বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে খেসারত দিতে হয়।
ঈশ্বরদী সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুস সবুর খান বলেন, সরকারী কাজে বাধাদান, জীবনের নিরাপত্তা, চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগে আমি ঈশ্বরদী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছি। আমি কোন প্রকার অন্যায় কর্মকান্ডের সাথে নেই।
তবে, চাঁদা দাবি ও মারপিটের কথা অস্বীকার করে কলেজ কর্তৃপক্ষের দূর্নীতির প্রতিবাদ করছেন বলে দাবি করেন ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রাকিবুল হাসান রনি । তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে কথা বলার সময় স্যারদের সাথে বাকবিতন্ডা হয়। শিক্ষকরা যদি এই ধরনের অপকর্ম করতেই থাকে তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আন্দোলনে যাব বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিন বলেন, ঈশ্বরদী সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. আব্দুস সবুর খান বাদী হয়ে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারন সম্পাদক ও কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারন সম্পাদকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৯ নভেম্বর পেশাগত কাজ করতে গিয়ে ভূমিমন্ত্রীপুত্র তমালের এই ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার হয় পাবনার ৪ সাংবাদিক। এ ঘটনায় পুলিশ এখনো চার্জশীট দেয় নি।
কয়েক মাস আগে সামাজিক মাধ্যমে রাজধানীর একটি বারে রনির মাদক সেবনের ছবি ভাইরাল হয়। এসব কর্মকান্ডে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হলে রনির বহিষ্কার দাবি উঠলেও, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের প্রত্যক্ষ আশীর্বাদে ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় সে।


