বিপন্ন প্রাণ প্রতিবেশ : অস্তিত্ব সংকটে চলনবিল


।। রইসুল রিজভী জয় ।।
‘সম্মুখে যতদূর দেখা যায় বিলের অবারিত উদারতা, চোখের দৃষ্টি কোথাও বাধা পায় না, ছুটতে ছুটতে অবশেষে ধোঁয়া, কুয়াশা আর মেঘ মিলিয়ে যেখানে দিগন্তের মতো রচনা করেছে, সেখানে গিয়ে আপনি বাধা পায়’। অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তম বিল চলনবিলের বর্ণনায় এভাবেই বিমুগ্ধ অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী। চলনবিল নিয়ে লিখেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও। অথচ, অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আর অফুরন্ত সম্পদের আধার এই বিলের অস্তিত্বই এখন হুমকির সম্মুখীন।
ফুল, ফসল আর জলোকল্লোলে কবে চলনবিলের বয়ে চলার শুরু হয়েছিল, সে ইতিহাস অজানা। তবে হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে এর প্রবাহমানতা যে সমসাময়িক ইতিহাসবিদদের তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক সময় পাবনা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১১ উপজেলার ২২ নদী আর অসংখ্য খাল-বিল জুড়ে বিস্তৃত ছিল চলনবিল। দেশের একমাত্র প্রবাহমান বিলটিতে বারোমাস নিরন্তর জলধারা চলমান থাকত, তাই তার এই নামকরণ।
তবে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব আর উন্নয়নের নামে সরকারি বেসরকারি সংস্থার অপরিকল্পিত, অপরিণামদর্শী কর্মকান্ডের বলি হয়ে আজ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চলনবিল। পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়াই একের পর এক গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিত স্থাপনা। ফলে কমেছে দেশের বৃহত্তম বিলটির আয়তন, প্রাকৃতিক পরিবেশের বিরূপ প্রভাবে নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য
ধারণা করা হয়, ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময়েই চলনবিলের সৃষ্টি। আসলে চলনবিল অনেকগুলো ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। বর্ষায় এই বিলগুলোতে জলপ্রবাহ বেড়ে একসঙ্গে বিশাল এক বিলের সৃষ্টি হয়। বর্তমানে বিলের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পাবনা জেলার নুননগরের কাছে অষ্টমনীষা পর্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রশস্ততম দিকটি উত্তর-পূর্ব কোনাকুনি। নাটোরের সিংড়া থেকে গুমানী পাড়ের কচিকাটা পর্যন্ত এ বিলের সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় চব্বিশ কিলোমিটার দীর্ঘ। নাটোরের সিংড়ার পূর্বপ্রান্ত থেকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ভাদাই নদীর পূর্ব পাড় পর্যন্ত বিলের পূর্ব সীমানা।
চলনবিলকে বলা যায়, ধন-ধান্যে মৎস্যে ভরা। দিগন্ত বিস্তৃত সুবিশাল জলরাশি, শাপলা, পদ্ম আর লতাগুল্মের আড়ালে কচ্ছপ, ঝিনুক, শুশুকের লুকোচুরি। মিঠে পানির নানা প্রজাতির মাছ আর সে মাছের খোঁজে মাছরাঙা, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, কানিবক আর শীতের পাখিদের নিত্য আনাগোনা। সব মিলে চলনবিল যেন শিল্পীর নিখুঁত তুলিতে আঁকা এক বর্ণিল ক্যানভাস। চোখ ফেরানো দায়।
শুধু নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যই নয়, চলনবিল প্রাকৃতিক সম্পদেরও অফুরন্ত ভান্ডার। বিল অঞ্চলের অর্ধকোটি মানুষের জীবন জীবিকার উৎস। তবে জলবায়ু পরিবর্তন আর অপরিকল্পিত উন্নয়ন চেষ্টার কারণে, এখন সবই যেন অতীত। ফারাক্কার প্রভাবে এ প্রাকৃতিক জলাধার এখন বছরের বেশিরভাগ সময়ই থাকে জলশূন্য।
১৯০৯ সালে জরিপে যে বিলের বিস্তৃতি ছিল এক হাজার আটাশি বর্গ কিলোমিটার, তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটারে। পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সড়ক বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পকে চলনবিলের বিপন্নতার জন্য দায়ী করছেন পরিবেশবিদ ও স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ফসল রক্ষার কথা বলে চলনবিলের উৎসমুখে সুইচগেট, রাবার ড্যাম নির্মাণ করেছে। বড়াল, আত্রাইসহ বিলের সংযুক্ত নদীতে দেয়া হয়েছে ক্রসবাঁধ। যা চলনবিলের মৃত্যু ডেকে এনেছে। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ুতে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন।
সে ধ্বংসযজ্ঞে পাউবোর সঙ্গে তাল মেলাতে পিছিয়ে থাকেনি সড়ক বিভাগও। কানেকটিভিটি বাড়ানোর কথা বলে চলনবিলের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অপরিকল্পিত মহাসড়ক তৈরি করে চলনবিলকে খন্ডিত খন্ডিত করেছেন তারা। বিলের বুক চিরে নির্মিত হয়েছে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়ক, চাটমোহর-মান্নাননগর মহাসড়কসহ অসংখ্য আঞ্চলিক সড়ক। এ মহাসড়কগুলো চলনবিলের স্বাভাবিক যে চলন বা প্রবাহ তা নষ্ট করেছে। এতে বিলাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্যে বিরূপ প্রভাব দেখা দিয়েছে।
চলনবিল উদ্ধার আন্দোলনের সদস্য সচিব এস এম মিজানুর রহমান জানান, চলনবিলে কখনোই পরিবেশগত সমীক্ষা করে কোন উন্নয়ন করা হয়নি। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে এ অঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশে। শুধু জীববৈচিত্র্য ধ্বংসই নয়, ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে চলনবিল নির্ভর কয়েক লক্ষ মানুষের জীবন জীবিকায়।
এক সময় সুস্বাদু দেশীয় মাছের প্রাচুর্যতায় যে বিলের সুখ্যাতি ছিল দেশজুড়ে, সেই চলনবিল এখন মাছশূন্য। গত ৩০ বছরে উৎপাদন কমেছে ৬৩ শতাংশ। গাঙচিংড়ি, খরশলা, লেটুকি, বাঁশপাতা, ফাতাশি, নান্দিনা, বউ, ভাঙন, ঘোড়া, মহাশোল, তিলাশোল, রেনুয়াসহ অসংখ্য মাছের নাম উঠেছে বিলুপ্তির খাতায়। বিলুপ্তির পথে দেশি কৈ, মাগুর, ভেদাসহ বিভিন্ন প্রজাতি। ভরা মৌসুমে মিলছে না মাছ। চরম দুর্দশায় দিন কাটছে বংশ পরম্পরায় মাছ ধরে আসা জেলে পরিবারগুলোর।
মৎস্য বিভাগের তথ্য বলছে, গত শতকের আশির দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত স্লুইচ গেট ও বাঁধে, শুরু হয় চলনবিলের মরুকরণ। কমে যায় গভীরতা। পলি পড়ে ভরাট হয় জলাভূমি। এতে কমে যায় মাছের বিচরণক্ষেত্র, স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় বাধাগ্রস্ত হয় প্রজনন। কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় অস্তিত্ব হারায় দেশি মাছের বিভিন্ন প্রজাতি। চলনবিলের বিপন্নতায় বিপাকে পড়েছেন কৃষিজীবীরাও।
জলবায়ু পরিবর্তন ও চাষাবাদে যথেচ্ছ কীটনাশকের ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় কালক্রমে বিলুপ্ত হয়েছে চলনবিলের ৭২ প্রজাতির মাছ,৭১ প্রজাতির পাখি, ২৮ প্রজাতির প্রাণী, ১৭ প্রজাতির সরীসৃপ আর নানা ধরনের জলজ সম্পদ। হারানোর তালিকায় রয়েছে ৪১ জাতের আউশ ধান ও ১০ জাতের আমন ধান।
বর্ষার পানি নামার পর চলনবিলের বুকজুড়ে আবাদ হয় বোরো ধান, সরিষা, রসুন, গম প্রভৃতি ফসলের। অপার জলসমুদ্র, চলনবিল পরিণত হয় সবুজের গালিচায়। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ফসলের মাঠ দেখে চোখ জুড়ালেও, গত কয়েক বছর ধরে প্রশান্তি নেই কৃষকের মনে। কারণ, অভাবনীয় বাস্তবতায় ক্রমশ পানিশূন্য হয়ে পড়ছে চলনবিল। এক সময় যে বিলের পানিতেই সারা বছর চলেছে সেচের কাজ, সেখানেই শুষ্ক মৌসুমে এখন পানির জন্য হাহাকার। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এতে চাষাবাদে খরচ বাড়ার পাশাপাশি, বিরূপ প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশেও।
সম্প্রতি চলনবিল অধ্যুষিত পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা মিলেছে ভয়ানক এই চিত্রের। পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় এ অঞ্চলের কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। প্রায় ১২-১৫ ফুট মাটির নিচে গর্ত করে ডিজেলচালিত ও বিদ্যুতচালিত মেশিন বসানো হয়েছে। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে প্রতিবছর পানির স্তর আরও নিচে নামছে। ফলে বিপাকে পড়ছেন বিলনির্ভর কৃষিজীবী মানুষ।
বিগত কয়েক বছর ধরে চলনবিলাঞ্চলে গভীর ও অগভীর নলকূপে পানি না ওঠায় বহু কৃষক সংকটে পড়ছেন। ইরি বোরো আবাদে যে পরিমাণ পানির প্রয়োজন সে পরিমাণ পানি এ অঞ্চলের খালবিল ও নদী নালায় রিজার্ভ থাকছে না। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলনে পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষি কাজে ব্যবহৃত হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে সেচ কাজ করে সাময়িক কৃষি কাজে সুবিধা বাড়ালেও তার বিরূপ প্রভাবে পানির স্তর আরও নিচে নেমে যায়। বর্তমানে, চলনবিল অঞ্চলে কৃষি কাজে ব্যবহৃত ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ শতকরা প্রায় ৯৮ ভাগ। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচ কাজে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
এসব আশঙ্কার মিলেছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও। সম্প্রতি, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, চলনবিল অঞ্চলে বিগত কয়েক দশকে তাপমাত্রা বেড়েছে বহুগণ, খরা, অসময়ে বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। চলনবিলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় পরিবেশগত সমীক্ষা সাপেক্ষে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবেশগত সমীক্ষা ছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো হয়ত দুর্গম এলাকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় গতি এনেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ডেকে এনেছে চলনবিলের প্রাণ প্রকৃতি ও বিলনির্ভর মানুষের জীবন জীবিকায়। আমাদের উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কোন প্রকল্প নেয়ার আগে ভেবে দেখা উচিত, কার জন্য উন্নয়ন, এবং সে উন্নয়ন ওই জনগোষ্ঠীর কোন কাজে লাগবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা প্রতিনিয়তই উন্নয়নের নামে প্রকৃতির ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ করছি। প্রকৃতি যদি তার ওপর অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়, তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা ধারণা করাও দুঃসাধ্য!
প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি এই চলনবিল একেক ঋতুতে সাজে একেক রূপে। কখনও সবুজে সবুজময়, কখনও সোনালী ফসলে ঢাকা আবার কখনও যতদূর চোখ যায় অথৈ জলরাশি, সবমিলে যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। অযাচিত হস্তক্ষেপে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, চলনবিলকে চলতে দেয়া হোক তার মতো করেই।
প্রাকৃতিক সকল বিপর্যয় এড়িয়ে ভালো থাকুক চলনবিল, বেঁচে থাক বাংলাদেশ।