নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
লাল-নীল-বেগুনীসহ হরেক রঙের গেঞ্জিতে ভরপুর পাবনা জেলা ও তার আশাপাশ
এলাকায়। মূলত গার্মেন্টসের ছোট কাপড়কে (ঝুট) পুঁজি করে পাবনায় দেড় হাজারের
মতো হোসিয়ারি শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে।
দিন রাত শ্রম দিচ্ছেন কারিগররা। এসব
কারখানায় তৈরি করা গোলগলা গেঞ্জি, স্যান্ডো গেঞ্জি, টি-শার্ট, কলারশার্ট,
টাউজারসহ নানা হোসিয়ারি পণ্য শুধু দেশে নয় যাচ্ছে বিদেশেও।
উদ্যোক্তাদের
অর্থনৈতিক সঙ্কট আর শ্রমিক স্বল্পতার মধ্যেও উত্তরবঙ্গের চাহিদা মিটিয়ে
বর্তমানে ভারত, মালয়েশিয়া, দুবাই, আফ্রিকায় রফতানি হচ্ছে পাবনার হোসিয়ারি
পণ্য। আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। তবে এই শিল্পের পুরনো ঐতিহ্য রক্ষা করে আরও
সম্প্রসারণের জন্য সরকারের আরও সহযোগিতা কামনা করেছেন ব্যবসায়ীরা।
জানা
গেছে, রমরমা ব্যবসায় স্থানীয় ও রফতানি মিলিয়ে সপ্তাহে প্রায় আড়াই কোটি
টাকার লেনদেন হচ্ছে। সে হিসেবে বছরে এখানকার ব্যবসায়ীদের লেনদেন প্রায় ১২০
কোটি টাকার ওপরে। যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজার হাজার দক্ষ-অদক্ষ
শ্রমিকের। এছাড়াও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প (এসএমই)
ফাউন্ডেশন ক্লাস্টার এরিয়া হিসেবে উদোক্তাদের জন্য নানা সুবিধা দেয়ার
চেষ্টা করে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাবনায় হোসিয়ারি কারখানার
আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর বছর ছিল ১৯০৫ সাল। সে সময় এখানকার স্যান্ডো গেঞ্জি
আর জাঙ্গিয়ার রমরমা ব্যবসা ছিল। উন্নত সুতা, দক্ষ শ্রমিক আর নৌপথের সহজ
যোগাযোগ ব্যবস্থায় উপ-মহাদেশের গেঞ্জির বাজার খুব সহজেই পাবনার ব্যবসায়ীদের
নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এ শিল্পের ভরা জোয়ারে ভাটা নামে ১৯৪৭ সালে। ১৯৭১-এর
যুদ্ধের সময় থেকেই বহু ব্যবসায়ী পাবনা ছেড়ে নারায়ণগঞ্জ চলে যান। ১৯৭২-৭৩
সালের দিকে হোসিয়ারি শিল্প একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পাবনার অর্থনীতিতে ধস
নামে। বেকার হয়ে পড়েন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার দক্ষ শ্রমিক।
ব্যবসায়ীদের
সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৫ সালের দিকে পাবনায় ঝুট ব্যবসার প্রচলন ঘটে।
সেসময় সীমিত আকারে হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে
ঝুট শিল্পের ব্যবসা শুরু করেন। ফলে কিছু শ্রমিকের কর্মসংস্থানও হয়। ঢাকাসহ
দেশের বিভিন্ন কাপড়ের ও গার্মেন্টস কারখানা থেকে নমুনা কাটিংয়ের কাপড়,
পরিত্যক্ত কাপড় মিল থেকে কম দামে কিনে এ গেঞ্জি তৈরি শুরু করেন।
ব্যবসায়ীরা
জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে এসব গেঞ্জি জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে ফেরি করে
বিক্রি করা হতো। ধীরে ধীরে পাবনার গন্ডি পেরিয়ে ঝুট পণ্য পার্শ্ববর্তী
জেলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ভাল সাফল্যের ফলে অন্য ব্যবসায়ীরা এই ব্যবসায়ে পুঁজি
বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। পুঁজি বিনিয়োগের তুলনায় আয় বেশি হওয়ার কারণে
বর্তমানে পাবনায় দেড় হাজারের বেশি ছোট-বড় ঝুট শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে।
সরেজমিন পাবনার বিভিন্ন হোসিয়ারি কারখানায় ঘুরে দেখা গেছে
শ্রমিকদের কর্মযজ্ঞ। কেউ কাটিং করছেন কেউ সেলাই কেউ আয়রন করে তা প্যাকেট
করায় ব্যস্ত। ঝুটের কোন কিছুই ফেলনা নয়। কাটিং করার পর টুকরো কাপড়ও কেজি
ধরে বিক্রি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ী হোসেন আলী (৫৫) বলেন,
আমি স্পোর্টসের মালামাল তৈরি করি। আমার পণ্য গোটা উত্তরবঙ্গসহ ভারত আর
মালয়েশিয়াতে পাঠাই। জহুরুল হোসিয়ারি প্রোপাইটর জহুরুল (৩৬) বলেন, রংপুর,
দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম থেকে পার্টি এসে নিয়ে যায়। বাচ্চা আর বড় উভয়ে ফুলহাতা
হাফহাতা গেঞ্জি তৈরি করি।
এর কাঁচামাল কোথা থেকে আসে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক
সময় ঢাকা তবে আমরা বেশিরভাগ সময় পাবনা থেকেই কিনি। মানভেদে দাম পরে কেজি
প্রতি ২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত। কাঁচামাল (ঝুট) কেনার পর তা লেবার
দিয়ে কাটিং করে সেলাই করতে হয়। এরপর আয়রন আর প্যাকেটিং হয়ে চলে যায় বাজারে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ শিল্পের জন্য বড় জায়গার
প্রয়োজন হয় না। শীতকালে অক্টোবর নভেম্বর ডিসেম্বর এবং গ্রীষ্মকালে এপ্রিল
মে ব্যবসা বেশ সরগরম থাকে বলেও জানা গেছে।
বৈশাখী হোসিয়ারির মালিক নিলয়
(৩০) বলেন, আমি ৫ বছর আগে ৬০ হাজার টাকায় ব্যবসা শুরু করি বর্তমানে আমার
পুঁজি দশ লাখে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, এখানে কাটিং খরচ ডজন প্রতি ২০ টাকা,
সেলাই ডজন প্রতি ৪০-১২০ টাকা এবং আয়রন ১ টাকা পিস হিসেবে হয়। পরবর্তীতে মোট
খরচ হিসেব করে সীমিত লাভ করা হয়।
প্যারাডাইস হোসিয়ারি প্রোপাইটর সুলতান
হোসেন (৩৫) বলেন, আমরা ভারতে যে পণ্য পাঠাই তা অনেক সময় প্রিন্টিং করতে হয়।
তবে প্রিন্টিং ছাড়াও পণ্য যায় ভারতে। শীতের সময় হাইনেক, গোলগলা ফুলহাতা
গেঞ্জির বেশ চাহিদা থাকে বলেও জানান।
পাবনার জিরো পয়েন্টের এআর
কর্ণার একটি পাইকারি হোসিয়ারি মার্কেট। প্রায় ১২শ’ দোকান আছে এখানে। এর
আশাপাশেও আছে অনেক পাইকারি বাজার। সপ্তাহের অন্য যে কোন দিনের চেয়ে
বৃহস্পতিবার একটু বেশি জমজমাট থাকে এসব এলাকায়। দূর দূরান্ত থেকে
ব্যবসায়ীরা এসে মালামাল নিয়ে ফেরেন গন্তব্যের উদ্দেশে।
এআর কর্ণারের শিপন
হোসিয়ারি, মায়মুনা হোসিয়ারি, কাজল হোসিয়ারি, স্বর্ণা হোসিয়ারি, মুহসিনা
হোসিয়ারি, দিপু হোসিয়ারিসহ অন্য হোসিয়ারি দোকনাগুলোতে নানা রং বেরঙ্গের
কাপড় দেখা গেছে। বিক্রেতারা এসে পাইকারি দামে পণ্য কিনতেও দেখা যায়। আবার এ
শিল্পের সঙ্গে জড়িত হয়ে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থানও হয়েছে।
জানা গেছে,
যারা সেলাই করে তাদের মজুরি ছেলেদের মাসে ১২ হাজার টাকার মতো আর মেয়েদের আট
হাজার টাকা। এছাড়াও যারা আয়রন করে তারা দৈনিক ৫০০ বা তার উপরে আয় করতে
পারে। অনেক শ্রমিক আবার চুক্তিতেও কাজ করে থাকে।
নিঝুম হোসিয়ারি এ্যান্ড
গার্মেন্টস মালিক আজিজুর রহমান (৩৫) বলেন, আমার মেশিন আছে ৫০টি অথচ শ্রমিক
আছে ৩৫ জন। এখানে শ্রমিকের বেশ সঙ্কট রয়েছে। তবে তার উৎপাদিন গেঞ্জি যাচ্ছে
উত্তরবঙ্গ, খুলনা এবং ভারত, দুবাই ও মালয়েশিয়ায়। পাবনায় যারা ব্যবসা করছে
তাদের অধিকাংশই অর্থনৈতিক সঙ্কটে আছে বলে জানান তিনি।
বাকিতে মালামাল
বিক্রি করতে করতে কেউ কেউ দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে বলেও জানান। জানা গেছে, গত
দুই বছরের মধ্যে পাবনায় বড় বড় অনেক কারখানা হয়েছে। যেখানে মেশিন কমপক্ষে
১৫টি। তবে অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকের সঙ্কটের কারণে মেশিন বসিয়ে রাখতে
বাধ্য হচ্ছেন মালিকরা।
উদোক্তাদের অর্থ সঙ্কটের বিষয়ে এগিয়ে এসেছে এসএমই
ফাউন্ডেশন। পাবনা শহরের এসএমই হোসিয়ারি ক্লাস্টারের উদ্যোক্তাদের মধ্যে
স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ বিতরণের কার্যক্রম তারা চালু রেখেছে। সাউথ ইস্ট
ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ কোটি টাকা ৯ শতাংশ সুদে জামনাতবিহীন ঋণ হিসেবে বিতরণ
করার কথা। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের মধ্যে মাত্র ৭০ লাখ টাকা ঋণ
বিরতণ করা হয়েছে। ব্যাংকের ম্যানেজার উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে অনাগ্রহী।
উদ্যোক্তাদের বেশ অভিযোগ শাখা ব্যাংকের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে।
পাবনা
হোসিয়ারি মেনুফ্যাকচারিং গ্রুপের সভাপতি মনির হোসেন পপি বলেন, এ
শিল্পে পুঁজির সঙ্কটও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের সহায়তায় অনেক
উদ্যোক্তার উপকার হচ্ছে।
তবে এসএমইয়ের মাধ্যমে আরও বড় লোনের কথাও বলেন।
এক্ষেত্রে ব্যাংকের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। তিনি আরও
বলেন, আমাদের এখানের উৎপাদিত পণ্য ভারত মালয়েশিয়া, আফ্রিকা যাচ্ছে।
প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার ডজন (১২ পিসে এক ডজন) উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় ও রফতানি
মিলে সপ্তাহে লেনদেন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা হয় বলে জানান সভাপতি। তবে এ
শিল্পের প্রসারে সরকারের সুনজর আশা করেন তিনি।
এসএমই ফাউন্ডেশনের সহকারী
মহাব্যবস্থাপন আবু মঞ্জুর সাঈফ বলেন, আমরা উদ্যোক্তাদের নিয়ে নানা
ধরনের কাজ করছি। ট্রেনিং দেয়া, জামানতবিহীন ঋণের ব্যবস্থা, মার্কেটিং
বিষয়ে কাজ ইত্যাদি। তবে ফাউন্ডেশন আরও জনবল ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী হলে
উদ্যোক্তাদের জন্য আরও ভূমিকা রাখতে পারবে বলেও জানান তিনি।
পাবনা চেম্বার
অব কমার্সের দায়িত্বশীল একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ শিল্পের একটি
ঐতিহ্য আছে। নানা জটিলতার কারণে অনেক সঙ্কটও আছে। তবে এর একটি বাজার আছে
স্থানীয়সহ বিশ্বেও। তাই পাবনা চেম্বার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তবে
উদ্যোক্তাদের জন্য যারা কাজ করে সরকারের সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
দেশীয়
কাঁচামাল ও দেশীয় শ্রমিকের তৈরি এ পণ্যটির চাহিদা দিন দিন দেশে-বিদেশে
যেমন বাড়ছে। তেমনি বেকারত্ব ঘুচিয়ে কর্মসংস্থানও হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের আগ্রহ
ধরে রাখা গেলে অনেক দেশেই রফতানির সম্ভবনা বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে বৈদেশিক
মুদ্রার আয়ও। আর উদ্যোক্তাদের নানা সঙ্কট মেটানো তথা আগ্রহ ধরে রাখতে
সরকারের বিশেষ দৃষ্টির কথা বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্রঃ জনকন্ঠ
