প্রসঙ্গঃ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও একটি জাতির অন্ধকার ভবিষ্যৎ


।। পান্জাব বিশ্বাস ।।

আজকাল টিভি খুললেই দেখছি প্রসঙ্গটি সামনে  আসছে। অবিভাবকরা উদ্বিগ্ন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমান সময়ে অবিভাবকদের একটা বড় অংশ প্রশ্নপত্র সংগ্রহের জন্য সিন্ডিকেট করে চুক্তি করছে তার সন্তানকে ভালো রেজাল্ট করাতে।

আমি নিজে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে শিক্ষার চলমান কার্যক্রমের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। অবাক হয়েছি, বোর্ডের খাতা দেখার জন্য যখন একজন পরীক্ষককে খাতা সরবরাহ করা হচ্ছে, তখনই তাকে সাবধান করা হচ্ছে বোর্ড থেকে, খাতায় লিখা থাকলেই নম্বর দিতে হবে। ভুল শুদ্ধ দেখা যাবেনা। কারণ, শিক্ষাবোর্ডগুলো পাশের হার বৃদ্ধির অনৈতিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। 

আমি নিজে নিশ্চিত হয়েছি, এমন ঘটনা বিরল নয় যে, একজন ছাত্র প্রাইভেট পড়েনি বলে ছাত্রকে কম নম্বর দিয়ে যে ছাত্র তার কাছে পড়ছে তাকে সর্বোচ্চ নম্বর দিচ্ছে। ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার। আইন করে, অভিযান চালিয়ে বন্ধ করা যাচ্ছেনা। সেখানেও এই অসাধু অবিভাবক শ্রেণীর সহযোগিতা রয়েছে। 

পিতা শিক্ষক পাহারা দিচ্ছে ছেলের নকল করার কাজে। ঘুষ দিচ্ছি ভর্তির জন্য। এ যেনো আত্মহত্যার মহোৎসব চলছে। 

পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যারা করছে, যারা সংরক্ষণ করছে, যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হচ্ছে কোনো জায়গায় প্রশ্ন নিরাপদ নয়। আমলা, শিক্ষক, অবিভাবক, সবাই এই পাপাচারে জড়িত হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, আমরা সবাই যদি অন্ধকার পছন্দ করি, তাহলে আঁধারের ঘন বর্ষায় জাতি ডুবতে কতক্ষণ? একটা দেশ চালাতে এইসব মানুষদের উপরেইতো নির্ভর করতে হচ্ছে। 

সবাই মুখে বড় বড় বুলি দিচ্ছে, ভেতরে তাকালে দেখছি পাপের পাহারাদারি করছে সেই।

এমসিকিউ তুলে দেয়ার কথা শুনে কিছু অবিভাবক দেখছি টিভিতে মতামত দিচ্ছে, এটা তুলে দিলে আমাদের ছেলেমেয়েরা কি শিখবে? তারাতো মুখস্ত করবে তখন। শিক্ষার মান নাকি নড়বড়ে হয়ে যাবে। মনে হচ্ছে আমরা লিখাপড়া শিখিনি। পরীক্ষা দেইনি। এমসিকিউ হলে সন্তান কিছু জানুক আর নাই জানুক সামান্য কয়েকটি টিক দেয়া সঠিক হলেই আমরা গর্বিত পিতা হতে পারি সে কথা বলছি না।

সবাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাইছি, কিন্তু সমাধানের উপায় কেউ বলছিনা। কিভাবে বলবেন? পাপ তো অন্তরে আমাদের। উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ কিছু বলছিনা। কে কাকে টপকাবে, কে কাকে ঠেকাবে তারই যেনো এক উৎসবের দেশ এটা। জাতির পিতা স্বয়ং এই নষ্টদের বিষয়ে দুঃখ করেছিলেন। এমনকি, তিনি যখন চোর দমনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তখনই হত্যা করা হয়েছিল এই মহান নেতাকে। 

ধিক্কার জানাবার ভাষা নেই। একটা জাতি যদি নষ্ট হয় কি করবে শাসক একা? রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে হতাশ হতে হয়। মিথ্যাচারে ভরপুর। কোন দলে কতজন ভালো লোক আছেন জরিপ করুন? তাকিয়ে দেখুন। কোন দল সত্যি বলছে বলুন? আর আমরা যারা দলকানা তারা নিজনিজ দলের ব্যর্থতা ঢেকে সব পাপাচারকে আড়াল করছি। কোন সরকারের সময় সঠিক নির্বাচন হয়েছে? কোন সরকার বিরোধীদল দমনের পথ অনুসরণ করেনি? কারা মিথ্যাচার করেনি? এমনকি জামাতের মতো ইসলামী দল একাত্তরের পাপ আজও মুক্ত মনে স্বীকার করলো না ফাঁসিতে যাওয়ার আগেও। আমরা এতোটাই দলকানা আলোকেও আঁধার দেখি। 

যে যখন যেখানে দ্বায়িত্ব পাচ্ছে, সেই নিজের আখের গোছাতে শুরু করে। যার কাছে যা রাখা হয়েছে এবং হয়েছিল, সেই ভেবেছে সেটা তার নিজের। রাজনৈতিক দলগুলোর বদনাম রয়েছে,কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত সরকারের সময় কি হয়েছিল? ব্যবসায়ীর একাউন্ট খালি করে নিয়েছিলো। লুটপাটের মহোৎসবের দেশে পরিনত হয়েছিল প্রিয় মাতৃভূমি। 

পরিশেষে বলবো এদেশে একজন মাহাথির মোহাম্মদের  প্রয়োজন। মাহাথিরের মতো চোখ বন্ধ করে হত্যা করার প্রয়োজন জাতীয় স্বার্থে কয়েক লক্ষ মানুষরুপী জানোয়ার। যোগ্যতা এবং সততা যার আছে সে যে দলেরই হোক সামনে টেনে এনে দ্বায়িত্ব দিতে হবে মাহাথিরের মতো। কিসের দল? কিসের রাজনীতি? কিসের গনতন্ত্র? চোর পরিবর্তনের? জাতির প্রয়োজন একজন মানুষ। একজন দয়ালু এবং নির্দয় মানুষ।